বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:০৬ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক::
ভুয়া খবর ছড়িয়ে দিতে ফেসবুককে প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনা প্রকাশের পর তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক। এরইমধ্যে অভিযোগের বিপরীতে ফেসবুকের বক্তব্য জানতে চেয়ে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে চিঠি দিয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় কমিটি জানিয়েছে, তারাও অভিযোগের জবাব পেতে জাকারবার্গকে কংগ্রেসে ডাকবেন। ঘটনার তদন্তও চলমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল ব্যক্তিগত গোপন তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া নয়; ফেসবুক তার গ্রাহকদের ওপর নজরদারিও চালায়। সংবাদের নামে ছড়িয়ে পড়া গুজব-এর বিরুদ্ধেও এখনও অনেক কাজ বাকী বলে মনে করছেন তারা।
মার্ক জাকারবার্গ
হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমেটরি থেকে পাওয়া ধারণা কাজে লাগিয়ে জাকারবার্গ বিশ্বের দুইশ কোটির বেশি মানুষকে একত্র করেছেন। পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে নতুনভাবে সংযুক্ত হওয়া ও বাজারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা বের করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগী সব সামাজিক মাধ্যমকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। ২০১০ সালে আরব বসন্তে ভূমিকা রাখার পর সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়নের আশা থেকেই সামাজিক মাধ্যমের উত্থান আরও ত্বরান্বিত হয়।
দেলাওয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সামাজিক মাধ্যম সম্পকে পড়ান এমন একজন প্রফেসর দান্নাগাল ইয়ং বলেন, ‘২০১১ সালে আমার কাছে মনে হতো ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলো প্রকৃতিগতভাবেই গণতান্ত্রিক আর এটা বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সহায়তা করবে’। তিনি আরও বলেন, এই নেটওয়ার্কগুলো আবর বসন্ত বা হ্যাশট্যাগ মি ঠু- এর মতো সমাজের বিভিন্ন খারাপ দিক উন্মোচনের আন্দোলন চালিয়ে যেতে নিঃসন্দেহে সহায়তা করেছে। কিন্তু মানুষ এখন এসবে অন্ধকার দিকগুলোও ধরতে শুরু করেছে। ইয়ং বলেন, জনগণ এসব প্লাটফর্ম ব্যবহার করলেও এর অর্থনৈতিক দিকটা বোঝে না। তারা বুঝতে পারে না সবাই যা করে ও যা ভাগাভাগি করে তার সবই পণ্যে পরিণত হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এতিহ্যগত মিডিয়া বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের মতো ‘দ্বাররক্ষী’ ব্যবহার না করে একদিকে সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন করছে। একই সঙ্গে গ্রাহকের তথ্য বিক্রি করা হলে তা বিপরীত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ইয়ং বলেন, যদি এই ব্যবসার মডেলে গ্রাহকের ডাটা বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো তাহলে তা গণতান্ত্রিক থাকতো। যেমনটি আপনি চাইবেন। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমগুলো এক ধরনের নজরদারির ব্যবস্থা করে যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে হেয় করে।
বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের ঘোষিত প্রথম লক্ষ্য ছিল ‘দ্রুত এগিয়ে চলা ও প্রথা ভেঙে ফেলা’। পরে তা হয় ‘বিশ্বকে এক করা’ এবং আরও পরে তা এসএকটি বৈশ্বিক সম্প্রদায় গড়ে তোলা।’ মার্ক জাকাবার্গের এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের সাপেক্ষে ফেসবুক এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তবে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের অভিযোগ ওঠার পর থেকে ফেসবুকের সুনাম কলঙ্কিত হতে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া খবরসহ বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে ভোটারদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।
ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের পর ফাঁস হয় গ্রাহকের তথ্য চুরির অভিযোগ। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম খবর দিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণা দলের সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফেসবুকের ৫ কোটি গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহার করেছে। খবরটি আটলান্টিক মহাসাগরের দুইপাড়েই আলোড়ন তোলে। এ ঘটনায় যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই ফেসবুকের প্রধান নির্বাহীর কাছে কৈফিয়ত চেয়ে তলব করেছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে তদন্ত। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগীয় কমিটির ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ডিয়ানি ফেইনস্টেইন বলেছেন, গ্রাহকদের তথ্য বিষয়ে ফেসবুকের ধারণা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে কংগ্রেস উপস্থিত হতে হবে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচারণার কাজে ভাড়া করা রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের তথ্য ব্যবহার করার বিষয়ে কোম্পানিটির জবাবদিহিতার জন্য ডাকা কংগ্রেস বৈঠক ডাকায় হয়। সেখানে ফেইনস্টেইন বলেন বলেন, ‘৫ কোটি লোক তাদের গোপনীয়তা হারিয়েছে।’ তিনি বলেন, আমি মনে করি আমাদের সামনে ফেসবুকের প্রধানে আসা উচিত। তাদের আইনজীবী বা দ্বিতীয় ব্যক্তিও চলবে না। প্রথম ব্যক্তিকেই আসতে হবে। যদি সত্যি তারা নিয়ন্ত্রয়িতভাবে তাদের প্রতিষ্ঠান চালানোর জন্য প্রস্তুত থাকে তাহলে আসুক আর বলুক। তারা এমন সব ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারবে কিনা।
এর আগে একই অভিযোগে মার্ক জাকারবার্গের জবাব চেয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। জাকারবার্গের কাছে লেখা এক চিঠিতে আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে এর জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদীয় কমিটির প্রধান ডামিয়ান কলিন্স। চিঠিতে ফেসবুকের একজন ঊর্ধ্বতন নির্বাহীকে পার্লামেন্টের ডিজিটাল, কালচার, মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্টস বিষয়ক কমিটির সামনে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। কমিন্স সংবাদমাধ্যমকে বলেন, কমিটির সামনে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হবে ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ শুরু করলে গুজব ছড়ায় মার্ক জাকারবার্গ সরকারের কোনও পদে আসীন হতে যাচ্ছেন। গত বছর তিনি এ ‘বৈশ্বিক সম্প্রদায়’ গড়ে তোলা ভিশন ঘোষণা করেন। এই ভিশনে বলা হয়েছিল আরও মানুষ যে বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মোহমুক্ত হতে পারেন। জাকারবার্গ লিখেছিলেন, ‘বিশ্ব এখনও উদ্বিগ্ন ও বিভক্ত আর ফেসবুককে এখনও অনেক কিছু করতে হবে।’ কিন্তু সবার প্রথমে জাকারবার্গকে এবছর আরও তাৎক্ষণিক মিশন নির্ধারণ করতে হবে। আর তা হলো তার যুদ্ধে নিয়োজিত সামাজিক নেটওয়ার্ককে ঠিক করা।
এন্ডপয়েন্ট টেকরোলজিস অ্যাসোসিয়েটসের একজন প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও পরামর্শক রজার কায় বলেন, ফেসবুক অন্যান্য অনলাইন ফার্মের মতোই যারা তাদের গ্রাহকের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য ব্যবহার করে। তবে বিষয়টি খুব বেশি প্রকাশিত হয়নি। কায় বলেন, ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় কিন্তু সেটা কোনও সমস্যা নয়। সমস্যা হলো আপনার দীর্ঘমেয়াদি গতিবিধি। তবে প্রফেসর ইয়ং আশা প্রকাশ করে বলেন, গ্রাহকরা ফেসবুক ডাটার ওপর আরও ভাল নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে পারবে যদি তারা অনলাইনে গোপনীয়তার নীতি জানতে পারে। আর কীভাবে কী শেয়ার দিতে হবে তার সম্পর্কে তাদের সচেতন থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, গ্রাহকদের তাদের তথ্যের ওপর এত নিয়ন্ত্রণ আছে যা আমরা ভাবতেও পারি না। আমরা যদি ফেসবুকের সেটিংস পরিবর্তন করি তাহলে তারা সাড়া দিতে বাধ্য হবে।
সংবাদের নামে ছড়িয়ে পড়া গুজব নিয়ে ফেসবুক অনেক দিন ধরেই বিশাল চাপের মধ্যে রয়েছে। জর্জ মাসুন বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ বিষয়ের প্রফেসর এমিলি ভ্রাগা বলেন, সম্প্রতি কয়েক মাস হলো ফেসবুক ভুয়া খবর ঠেকানোর জন্য অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তাদের বিষয়টি নিয়ে আরও অনেক কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, ফেসবুক বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য তালিকা তৈরি করতে পারে। এতে করে গ্রাহক বিষয়গুলো নিয়ে আরও সচেতন হতে পারবে।